
ভূমিকা
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন থমকে যায় সময়, স্তব্ধ হয়ে যায় সভ্যতার চাকা। একুশ শতকের জৌলুসপূর্ণ পৃথিবীতে তেমনই এক অদৃশ্য আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগেও মানুষ যে প্রকৃতির কাছে কতটা অসহায়, তা এই মহামারি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। একটি অণুজীব, যা খালি চোখে দেখা যায় না, তা সমগ্র বিশ্বব্যবস্থাকে তছনছ করে দিয়েছে। এটি কেবল একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ের এক করুণ ইতিহাস। আধুনিক মানুষের অহংকার চূর্ণ করে দিয়ে করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ প্রমাণ করেছে যে, পারমাণবিক বোমার চেয়েও ধ্বংসাত্মক হতে পারে প্রকৃতির রুদ্ররোষ।
অদৃশ্য শত্রুর সাথে যুদ্ধই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ, যেখানে রণাঙ্গন পুরো পৃথিবী এবং যোদ্ধা প্রতিটি মানুষ।
– বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)
করোনা ভাইরাসের পরিচয় ও নামকরণ
করোনা ভাইরাস হলো ভাইরাসের একটি বিশাল গোত্র বা পরিবার, যা সাধারণত প্রাণী ও মানুষের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের রোগ সৃষ্টি করে। অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে এই ভাইরাসটিকে দেখতে অনেকটা মুকুটের (Crown) মতো মনে হয় বলে ল্যাটিন শব্দ ‘Corona’ অনুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে ‘করোনা ভাইরাস’। ২০১৯ সালের শেষের দিকে চীনে যে নতুন ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে, তার নাম দেওয়া হয় SARS-CoV-2। আর এই ভাইরাসের সংক্রমণে সৃষ্ট রোগটিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে COVID-19 (Corona Virus Disease 2019) নামকরণ করে।
উৎপত্তি ও বিস্তৃতি
২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম এক রহস্যময় নিউমোনিয়া সদৃশ রোগ শনাক্ত হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল যে, উহানের একটি সামুদ্রিক খাবারের বাজার (Wet Market) থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে। তবে দ্রুতই এটি মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হতে শুরু করে। চীনের প্রাচীর ভেদ করে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে থাইল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং পরবর্তীতে ইউরোপ ও আমেরিকায়। ২০২০ সালের ১১ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক মহামারি বা ‘Pandemic’ হিসেবে ঘোষণা করে। মুহূর্তের মধ্যে ইতালির ভেনিস থেকে আমেরিকার নিউইয়র্ক, ভারতের মুম্বাই থেকে বাংলাদেশের ঢাকা—সব জনপদ পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে।
রোগের লক্ষণসমূহ
করোনা ভাইরাসের লক্ষণগুলো সাধারণ ফ্লু বা সর্দি-কাশির মতোই, তবে এটি অনেক বেশি মারাত্মক হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো:
১. জ্বর: শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হওয়া।
২. শুষ্ক কাশি: একটানা খুকখুকে কাশি থাকা।
৩. শ্বাসকষ্ট: ফুসফুস সংক্রমিত হওয়ার ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।
৪. ক্লান্তি ও শরীর ব্যথা: প্রচণ্ড দুর্বলতা অনুভব করা।
৫. স্বাদ ও ঘ্রাণ শক্তি হারানো: অনেক রোগীর ক্ষেত্রে জিহ্বার স্বাদ এবং নাকের ঘ্রাণ শক্তি চলে যাওয়া।
৬. অন্যান্য: গলা ব্যথা, মাথাব্যথা, এবং ক্ষেত্রবিশেষে ডায়রিয়া।
লক্ষণগুলো সাধারণত ভাইরাস শরীরে প্রবেশের ৫ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে প্রকাশ পায়। তবে ভয়ের বিষয় হলো, অনেকের শরীরে কোনো লক্ষণ না থাকলেও তারা বাহক বা ‘Asymptomatic Carrier’ হিসেবে অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে।
সংক্রমণের মাধ্যম
করোনা ভাইরাস অত্যন্ত ছোঁয়াচে। এটি প্রধানত ড্রপলেট বা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়।
১. সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশির সময় নির্গত জলকণায় এই ভাইরাস ভেসে বেড়ায় এবং সুস্থ ব্যক্তির নাক, মুখ বা চোখের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে।
২. আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে, যেমন করমর্দন বা কোলাকুলি করলে।
৩. ভাইরাসযুক্ত কোনো তল বা বস্তু স্পর্শ করে সেই হাত দিয়ে নাক, মুখ বা চোখ স্পর্শ করলে।
বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রভাব
করোনা ভাইরাস কেবল মানুষের প্রাণই কেড়ে নেয়নি, এটি পুরো বিশ্বের আর্থ-সামাজিক কাঠামোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী:
১. স্বাস্থ্যখাতে বিপর্যয়: উন্নত বিশ্বের দেশগুলো, যেমন আমেরিকা, ইতালি, ব্রিটেন বা স্পেনের মতো দেশগুলোর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও এই ভাইরাসের প্রকোপে ভেঙে পড়েছিল। হাসপাতালের করিডোরে রোগীদের ভিড়, অক্সিজেনের অভাব এবং মর্গে লাশের স্তূপ—এই দৃশ্যগুলো বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে।
২. অর্থনৈতিক মন্দা: লকডাউনের কারণে কল-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) মতে, ১৯৩০ সালের মহামন্দার পর বিশ্ব অর্থনীতি এমন ভয়াবহ সংকটে আর পড়েনি। কোটি কোটি মানুষ চাকরি হারিয়েছে, দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে বিশাল জনগোষ্ঠী।
৩. শিক্ষাখাতে স্থবিরতা: করোনা মহামারির অন্যতম বড় ভুক্তভোগী ছিল শিক্ষার্থীরা। বিশ্বের প্রায় সব দেশে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। যদিও অনলাইন শিক্ষার প্রচলন হয়েছে, তবুও গ্রাম ও শহরের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য বা ‘Digital Divide’ প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে, বেড়েছে বাল্যবিবাহ।
৪. সামাজিক ও মানসিক প্রভাব: দীর্ঘমেয়াদী লকডাউন ও সামাজিক দূরত্বের কারণে মানুষের মধ্যে একাকিত্ব, বিষণ্নতা ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা বাড়ার খবরও পাওয়া গেছে বিভিন্ন গবেষণায়।
বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি
বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ২০২০ সালের ৮ মার্চ। এর দশ দিন পর, ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। জনঘনত্বের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ হওয়ায় এখানে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি ছিল অত্যধিক। সরকার সংক্রমণ রোধে ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে, যা কার্যত লকডাউন ছিল।
বাংলাদেশে করোনার প্রভাবে নিম্নবিত্ত ও দিনমজুর মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছিল। ‘দিন আনি দিন খাই’ মানুষের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। তবে সরকার, বিত্তবান ব্যক্তি এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম ছিল প্রশংসনীয়। আমাদের দেশের চিকিৎসকরা বা সম্মুখসারির যোদ্ধারা (Frontline Fighters) জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেবা প্রদান করেছেন। পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং সাংবাদিকরা করোনা নিয়ন্ত্রণে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন।
প্রতিরোধ ও প্রতিকার
করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধিগুলো হলো:
১. মাস্ক পরিধান: ঘরের বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করা।
২. সামাজিক দূরত্ব: একে অপরের থেকে অন্তত ৩ ফুট বা ১ মিটার দূরত্ব বজায় রাখা।
৩. হাত ধোয়া: সাবান ও পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে ঘন ঘন হাত ধোয়া অথবা অ্যালকোহলযুক্ত স্যানিটাইজার ব্যবহার করা।
৪. জনসমাগম এড়িয়ে চলা: ভিড় এড়িয়ে চলা এবং অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে না যাওয়া।
৫. হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার: হাঁচি বা কাশির সময় টিস্যু বা কনুই দিয়ে মুখ ঢাকা।
টিকা বা ভ্যাকসিন কার্যক্রম
মহামারি মোকাবিলার একমাত্র দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হলো টিকাদান। বিজ্ঞানের আশীর্বাদে খুব দ্রুততম সময়ে করোনার টিকা আবিষ্কৃত হয়েছে। ফাইজার (Pfizer), মডার্না (Moderna), অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা (Oxford-AstraZeneca), সিনোফার্ম (Sinopharm) সহ বিভিন্ন টিকা বিশ্বব্যাপী প্রয়োগ করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে গণটিকা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, যা সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। টিকা গ্রহণের মাধ্যমে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যা ভাইরাস প্রতিরোধে সাহায্য করে।
করোনার ইতিবাচক দিক (পরিবেশ ও মানবিকতা)
মুদ্রার উল্টো পিঠের মতো করোনার কিছু ইতিবাচক দিকও ছিল। লকডাউনের কারণে কল-কারখানা ও যানবাহন বন্ধ থাকায় কার্বন নিঃসরণ কমে গিয়েছিল। ফলে প্রকৃতি তার হারানো সজীবতা ফিরে পেয়েছিল। কক্সবাজারের সৈকতে ডলফিনের খেলা কিংবা ঢাকার বাতাসে দূষণ কমার দৃশ্য আমরা দেখেছি। এছাড়া, মানুষে মানুষে সহমর্মিতা ও মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে এই সময়ে। যান্ত্রিক জীবনে মানুষ পরিবারের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছে।
উপসংহার
করোনা ভাইরাস মানবজাতিকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এটি আমাদের শিখিয়েছে যে, আমরা যতই উন্নত হই না কেন, প্রকৃতির কাছে আমরা অসহায়। তবে মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও বিজ্ঞানের প্রচেষ্টায় এই অন্ধকার কেটে যাচ্ছে। টিকা আবিষ্কার এবং সচেতনতার মাধ্যমে আমরা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছি। এই মহামারি থেকে আমাদের শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বৃদ্ধি, গবেষণায় গুরুত্বারোপ এবং পরিবেশ রক্ষায় আমাদের আরও যত্নবান হতে হবে। আশা করা যায়, খুব শীঘ্রই পৃথিবী সম্পূর্ণরূপে করোনামুক্ত হবে এবং আমরা একটি সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ ভোরের দেখা পাব।
করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
১. প্রশ্ন: করোনা ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল কোথায়?
উত্তর: করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ এর উৎপত্তিস্থল চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর।
২. প্রশ্ন: করোনা ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম কী?
উত্তর: এই ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম হলো SARS-CoV-2 (Severe Acute Respiratory Syndrome Coronavirus 2)।
৩. প্রশ্ন: প্যান্ডেমিক (Pandemic) অর্থ কী?
উত্তর: যখন কোনো রোগ বা মহামারি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সীমা পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাকে প্যান্ডেমিক বা বৈশ্বিক মহামারি বলা হয়।
৪. প্রশ্ন: কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশন এর মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: কোয়ারেন্টাইন হলো সুস্থ ব্যক্তিকে আলাদা রাখা যাতে সে সংক্রমিত না হয় বা রোগ না ছড়ায়, আর আইসোলেশন হলো আক্রান্ত রোগীকে সুস্থদের থেকে আলাদা রাখা।
৫. প্রশ্ন: বাংলাদেশে কবে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়?
উত্তর: বাংলাদেশে ২০২০ সালের ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়।
Leave a Reply