
ভূমিকা
একবিংশ শতাব্দীর এই লগ্নে দাঁড়িয়ে বিশ্ব আজ প্রযুক্তির জাদুকরী স্পর্শে আমূল বদলে গেছে। আধুনিক সভ্যতার এই অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এটি একটি আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্র গঠনের সুদৃঢ় অঙ্গীকার।
‘মানুষের শক্তি যখন বুদ্ধি দিয়া যন্ত্রের মধ্যে নিজেকে বিস্তার করে, তখনি মানুষ জয়ী হয়।’ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ডিজিটাল বাংলাদেশ কী?
ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে মূলত এমন এক আধুনিক ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (ICT) সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্য বিমোচন নিশ্চিত করা হয়। এটি এমন এক পরিবেশ যেখানে প্রতিটি নাগরিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতার সুফল ভোগ করবে।
রূপকল্প ২০২১-এর প্রেক্ষাপট
২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘রূপকল্প ২০২১’ ঘোষণা করে, যার মূল স্তম্ভ ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ। লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া।
আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন
দেশের ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ফাইবার অপটিক ক্যাবল পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে মহাকাশ জয় করে বাংলাদেশ আজ নিজের সক্ষমতা জানান দিচ্ছে।
ই-গভর্ন্যান্স ও স্বচ্ছতা
ডিজিটাল বাংলাদেশের অন্যতম স্তম্ভ হলো ই-গভর্ন্যান্স। সরকারি সেবা এখন সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয়। বিভিন্ন অ্যাপ এবং ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ঘরে বসেই জন্ম নিবন্ধন, ট্যাক্স পরিশোধ এবং পাসপোর্টের আবেদন করা সম্ভব হচ্ছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন
বর্তমানে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ই-বুক এবং অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের আধুনিক বিশ্বের উপযোগী করে তুলছে।
‘জ্ঞানের আলো একবার জ্বলিলে তাহার নির্বাণ নাই।’ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্বাস্থ্যসেবায় টেলিমেডিসিন
ডিজিটাল বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে এনেছে আমূল পরিবর্তন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এখন ভিডিও কলের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারছেন। জাতীয় স্বাস্থ্য বাতায়ন (১৬২৬৩) এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ই-কমার্স
ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার বাংলাদেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। বিকাশ, রকেট বা নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবা সাধারণ মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। ই-কমার্সের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা সরাসরি পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।
ফ্রিল্যান্সিং ও কর্মসংস্থান
বর্তমানে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ তরুণ ফ্রিল্যান্সিং এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। এটি বেকারত্ব দূর করতে এবং দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কৃষি খাতে প্রযুক্তির ছোঁয়া
‘ই-কৃষি’র মাধ্যমে কৃষকরা এখন মোবাইল অ্যাপের সাহায্যে সার, বীজ এবং পোকামাকড় দমন সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাচ্ছেন। এটি কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও ডিজিটাইজেশন
বর্তমানে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন সরকারি অনুদান সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে উপকারভোগীর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, যা দুর্নীতি রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
ডিজিটাল লিটারেসি বা তথ্যপ্রযুক্তিগত সাক্ষরতা
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে নাগরিকদের তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। সরকার বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি করছে।
নিরাপত্তা ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষা
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এবং সিসিটিভি সার্ভেইল্যান্সের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। সাইবার ক্রাইম দমনেও আইন ও প্রযুক্তিগত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
গ্রাম ও শহরের ব্যবধান হ্রাস
ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (UDC) স্থাপনের ফলে গ্রামীণ মানুষ এখন শহরের মতো সুযোগ-সুবিধা নিজ এলাকায় বসেই লাভ করছে। এটি বৈষম্য নিরসনে এক বড় পদক্ষেপ।
পরিবেশ রক্ষায় ডিজিটাইজেশন
কাগজবিহীন অফিস (Paperless Office) বা ই-ফাইলিং ব্যবস্থার ফলে কাগজের অপচয় কমছে, যা পরোক্ষভাবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জসমূহ
অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার মাঝেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে যেমন—সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি, ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার। এ বিষয়গুলোতে সজাগ দৃষ্টি রাখা জরুরি।
স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১: পরবর্তী লক্ষ্য
ডিজিটাল বাংলাদেশের সফল বাস্তবায়নের পর এখন লক্ষ্য হলো ২০৪১ সালের মধ্যে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ে তোলা। যেখানে প্রতিটি নাগরিক হবে স্মার্ট, অর্থনীতি হবে স্মার্ট এবং সরকার হবে স্মার্ট।
‘ভবিষ্যৎ তাদেরই যারা তাদের স্বপ্নের সুন্দরতায় বিশ্বাস করে।’ – এলিনর রুজভেল্ট
উপসংহার
ডিজিটাল বাংলাদেশ আজ আর নিছক কল্পনা নয়, এটি দৃশ্যমান বাস্তবতা। প্রযুক্তির এই সুফলকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ এখন সমৃদ্ধির পথে ধাবমান। তরুণ প্রজন্মের মেধা আর সরকারের সদিচ্ছা মিলে এক শোষণহীন ও প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. ডিজিটাল বাংলাদেশের চারটি স্তম্ভ কী কী?
উত্তর: মানবসম্পদ উন্নয়ন, ইন্টারনেটের সংযোগ প্রদান, ই-গভর্ন্যান্স এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের উন্নয়ন।
২. স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১ এর লক্ষ্য কী?
উত্তর: জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি এবং উদ্ভাবনী জাতি গঠনের মাধ্যমে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া।
Leave a Reply